হবসের প্রকৃতির রাজ্যের তত্ত্বের সাথে মিল খুঁজে পাওয়া যায় প্রাচীন ভারতীয় রাষ্ট্রতত্ত্বে, যেখানে উল্লেখ আছে সমুদ্রমন্থনের সময় অমৃত কুম্ভ সাগর থেকে উঠে এলে দেবতা অসুর উভয়ের মধ্যে একই বস্তু চাইতে লাগলো কিন্তু একই জিনিস সকলের পক্ষে পাওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং উভয়ের মধ্যে বিশ্বাসহীনতার কারণে সংঘর্ষে লিপ্ত হলো , প্রথম পর্যায়ে দেবতারা পরাজিত হয়, কারণ দেবতাদের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো কেউ ছিলনা পরে সকল দেবগন বিশিষ্ট কোন দেবতার সাথে চুক্তিবদ্ধ হলো (ইন্দ্র), যে দেবতাদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী ও নেতৃত্বদানে সক্ষম, সে আবার অন্য এক বিশেষ দেবতার সাহায্য নিয়ে (বিষ্ণু) অসুরদেরকে যুদ্ধে পরাজিত করে এর ফলে দেবতাগণ নিজেদের গৌরব পুনরায় ফিরে পায় ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে, সাম্রাজ্যের স্থাপন করে সুতরাং হবসের প্রকৃতির রাজ্যের ধারণা নিতান্তই অমূলক নয়। যুক্তির দ্বারা বিচার করলে পাশ্চাত্য ও প্রাচীন ভারতীয় রাষ্ট্রচিন্তার মধ্যে বহু সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায় ।প্রকৃত অর্থে গণতন্ত্র হলো স্বৈরাচারী শাসকদের অবাধ বিচরণের ক্ষেত্রে । যেখানে কেবল সাধারণ মানুষ ভোটাধিকারই পায়, এই কারণে গণতন্ত্র সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে বিকৃত রূপ ধারণ করে। প্লেটোর সমগ্রতা ও অ্যারিস্টটলের বিশেষের ধারণা অথবা হবসের প্রকৃতির রাজ্যের তত্ত্ব কোনোটি পরিপূর্ণ শাশ্বত সত্য নয় তা রাষ্ট্রের উৎপত্তি ও সমাজ ব্যবস্থা নিরূপণের একটা খন্ডিত অংশ মাত্র। উদাহরণ রূপে বলা যায় পিথাগোরাস তার জ্যামিতিক পদ্ধতির অবতারণার ক্ষেত্রে বলেছেন "বিশুদ্ধ সরলরেখা বা বিশুদ্ধ বৃত্ত বলে কিছুই হয় না যা আছে তা প্রমাণ নিরপেক্ষ অনুমান মাত্র।" অর্থাৎ প্রকৃত অর্থে অভিজাততন্ত্র , নিয়মতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র ,রাজতন্ত্র অথবা গণতন্ত্র , কোনটি সমাজ বা রাষ্ট্রের বিশেষ উপযোগী তা বিচার করার অবকাশ রয়েছে। আজ পর্যন্ত কোন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এর শাশ্বত চিরস্থায়ী সমাধান বলে যেতে পারেননি।
যেমন রুশোর সাধারণ ইচ্ছা আর সকলের ইচ্ছা সমার্থক নয় দুটির মধ্যে বিশেষ পার্থক্য আছে। কারণ সাধারণ ইচ্ছা শুধু সাধারণের স্বার্থের সঙ্গে জড়িত আর পক্ষান্তরে সকলের ইচ্ছা ব্যক্তিগত স্বার্থের বা বিশেষ ইচ্ছা সমষ্টি।
আবার অন্যদিকে যেমন মার্কসের চিন্তাভাবনা সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামো বদলে ফেলার মাধ্যমে সামাজিক সম্পদ গুলোকে পাল্টে দিলে এবং পুঁজিবাদী ও শ্রমিকদের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ক কে বিলুপ্ত করে দিলে দেখা যাবে পুঁজিবাদী সমাজ বেড়ে ওঠা মানুষগুলোর থেকে নতুন সমাজের মানুষ একেবারে আলাদা। উৎপাদন প্রক্রিয়া যুক্ত হয়ে শ্রমিক শ্রেণী যে পরিমাণ নতুন মূল্যের সৃষ্টি করে তার ভগ্নাংশের মতো তারা মজুরি বাবদ পায় এই উদ্বৃত্তের অংশ সিংহভাগ চলে যায় পুঁজিবাদী মালিকের হাতে সুতরাং বলা যায় বিদ্যমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় অবসান করতে শ্রমিক শ্রেণীর নিজেদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের মুক্তির তাগিদে সশস্ত্র বিপ্লবে আবির্ভূত হবে এবং শ্রেনীহীন সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলবে এটাই ছিল সমাজতন্ত্রের প্রকৃত স্বরূপ।
এত কিছু চিন্তাভাবনার পরেও দেখা যায় হেগেলের দর্শন ভাববাদী ও মার্কসের দর্শন বস্তুবাদী উভয়ের মধ্যে তার্কিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সমাজস্ত মানুষের নিজস্ব অভিজ্ঞতা বা ধ্যান-ধারণা সম্পূর্ণ পৃথক এবং তাদের কাছে এগুলি অপ্রাসঙ্গিক। উচ্চ সম্প্রদায়ের সঙ্গে নিম্ন সম্প্রদায় মানুষের মধ্যে চিন্তাভাবনার বিস্তর পার্থক্য থাকার কারণে স্বভাবতই উভয়ের মানসিক দ্বন্দ্ব যেটা কখনো বাহ্যিকভাবে প্রকাশ্য হয়ে পড়ে তা চিরকালীনই থাকবে।
কারণ আজকে যারা শ্রমিক শ্রেণী হয়ে রয়েছে কালকে তারাও নিজেদের বৌদ্ধিক চাহিদার কারণে মালিক শ্রেণীতে রূপান্তরিত হতে চাইবে। কাজেই সমাজে সমাজতান্ত্রিক চিন্তাভাবনার যে স্বরূপ তা কখনোই পূর্ণ বিকশিত হবে না।
তাই বর্তমান যুগের পরিপ্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে আধুনিক সভ্যতার অগ্রভাগে অনেক চিন্তাবিদগণ গণতন্ত্র ,নিয়মতন্ত্র ,রাজতন্ত্র ইত্যাদি নিয়ে অনেক গবেষণা করে ফেললোও এর কোন সুরাহা তারা করতে পারবেনা কারণ প্রত্যেকটা শাসনতন্ত্র কোন না কোন শাসনতন্ত্রের বিকৃত রূপ হয়ে দাঁড়াবে।
তাই আমার মতে, গণপ্রজাতান্ত্রিক রাজতন্ত্রই হলো সর্ব শ্রেষ্ঠ শাসন ব্যবস্থা। যেখানে শাসক কে হতে হবে উচ্চ দার্শনিক ও বৌদ্ধিক ক্ষমতা সম্পন্ন, যে জনগণের জন্য সর্বদা নীতি-নিষ্ঠ কার্যকলাপে জড়িত থাকবে এবং জনগণের সামনে উদাহরণ প্রস্তুত করবে তারাও যাতে রাষ্ট্রের দায় ব্যবস্থাকে নীতি-নিষ্ঠতার সাথে পালন করে।
আমার মতে "স্বাধীনতা হলো প্রকৃতির রাজ্য থেকে পাওয়া মানুষের মনুষ্যত্ব বিকাশের সহজাত অধিকার।"
"Freedom is the inherent right of human beings to human development, derived from the state of nature."- Satyajit Biswas.
—. ©® Satyajit Biswas
Read More?
https://thedailyreflexblog.blogspot.com/2025/12/yoga-digital-detox-ai-anxiety.html
Comments
Post a Comment